আগামী বাজেটে সহজ হচ্ছে ভ্যাট ব্যবস্থা, হিসাব ও রিটার্ন দাখিল হবে অনলাইনে

বর্তমানে ব্যবসায়ীরা ক্রয়-বিক্রয়ের হিসাব রেজিস্ট্রারে অর্থাৎ কাগজে-কলমেই রাখেন বেশি। সশরীরে যান ভ্যাট অফিসে। রিটার্নও দাখিল করেন কাগজে। এতে হয়রানি ও অনৈতিক লেনদেনের অভিযোগ উঠছে হরহামেশাই।

বর্তমানে ব্যবসায়ীরা ক্রয়-বিক্রয়ের হিসাব রেজিস্ট্রারে অর্থাৎ কাগজে-কলমেই রাখেন বেশি। সশরীরে যান ভ্যাট অফিসে। রিটার্নও দাখিল করেন কাগজে। এতে হয়রানি ও অনৈতিক লেনদেনের অভিযোগ উঠছে হরহামেশাই। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে আগামী বাজেটে ভ্যাট ব্যবস্থা সহজ করছে সরকার। কাগজে হিসাব রাখা ও রিটার্ন দাখিলের পাশাপাশি অনলাইনেও এ কাজটি করা যাবে। ব্যবসায়ীদের ক্রয়-বিক্রয়ের হিসাব বা বুক কিপিং সফটওয়্যারে রাখতে হবে। তাদের পছন্দ অনুযায়ী সফটওয়্যারেই হিসাব রাখা যাবে। বাজেটে এটাকে অগ্রাধিকার দেয়া হবে বলে জানিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।

এনবিআর কর্মকর্তারা বলছেন, উৎপাদন পর্যায়ে ভ্যাট ব্যবস্থা সহজই আছে। বিক্রয় ও সেবা পর্যায়ে ভ্যাট আদায় ব্যবস্থাকে আরো সহজ করতে হবে। যেন বিক্রেতা ও সেবাদাতাদের ভ্যাট আদায়ে বাড়তি জনবল ও অর্থ ব্যয় করতে না হয়। অটোমেটেড পদ্ধতিতে হিসাব হয়ে যায়। ক্রেতাকে দেয়া চালানের হিসাবও এনবিআরের সার্ভারে চলে যায়। ভ্যাট অফিসে রিটার্ন দাখিলের জন্য যেতে না হয়। এতে ব্যবসায়ীরা আগ্রহী হবেন। তারা উৎসাহ পাবেন।

গতকাল এক অনুষ্ঠানে এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান বলেন, ‘এবারের বাজেটে আমরা আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি নীতির প্রক্রিয়াগুলো সহজ করার। যেন ব্যবসায়ীদের জন্য সুবিধা হয়। আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমস—এ তিন খাতে যেন কমপ্লায়েন্ট হওয়ার খরচ এবং সরকারের কর, রাজস্ব না কমে, সেটাই আমাদের মূল লক্ষ্য।’

এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, ক্রেতার কাছ থেকে যেহেতু সরাসরি ভ্যাট নেয়া সম্ভব হচ্ছে না, সেহেতু বিক্রেতাকে ভ্যাটদাতা হিসেবে আইনে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। বিক্রেতাকে ভ্যাটের আওতায় নিবন্ধন করা হয়। বিক্রেতার সব ক্রয়-বিক্রয়ের জন্য জেনারেল অ্যাকাউন্টসের বাইরে আলাদা হিসাবপত্র রাখতে বলা হয়েছে। মাসের শেষে ভ্যাট সরকারি কোষাগারে জমা দিয়ে দাখিলপত্র দাখিল করতে বলা হয়েছে। বিক্রেতা যদি এসব পরিপালন করতে ব্যর্থ হয় তাহলে তার জন্য আইনে শাস্তির বিধান করা হয়েছে।

নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে ভ্যাট বিভাগের এক কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সর্বোচ্চ পর্যায়ের সহজীকরণ বলতে আমি বুঝি ক্রয়ের সময় ক্রেতা সরকারকে সরাসরি ভ্যাট দিয়ে দেবেন। বিক্রেতার কোনো দায় থাকবে না। কোথাও কোনো জটিলতার সৃষ্টি হবে না, মামলা-মোকদ্দমার উদ্ভব হবে না, ভ্যাট ফাঁকির প্রবণতা থাকবে না, অনিয়ম, দুর্নীতি ইত্যাদি থাকবে না—এমন একটা পরিবেশ নিশ্চিত করা। এমন পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য এখন অটোমেশনই একমাত্র পথ। অর্থবহ অটোমেশনের মাধ্যমেই একটা সহজ ভ্যাট ব্যবস্থা গঠন করা সম্ভব।’

এ বিষয়ে পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ডিজিটাল যুগে সবকিছু অনলাইনভিত্তিক হচ্ছে, এখনো যদি আমাদের ভ্যাট অফিসে সশরীরে যেতে হয়, কাগজপত্র জমা দিতে হয়; এখন চলবে পেপারলেস বিজনেস, পেপারলেস কমিউনিকেশন। এ যুগে পেপার নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করাটা কোনোভাবে যৌক্তিক মনে করি না। এটা ব্যবসায়ীদের হয়রানি লাঘবে এনবিআরের উদ্যোগগুলোর একটি বলে মনে করি। উদ্যোগটি সফল করতে ব্যবসায়ীদের এগিয়ে আসা উচিত। অনলাইনে হিসাব রাখা ও ভ্যাট দেয়া উচিত।’ ভ্যাটের সহনীয় একটি একক হার নির্ধারণও সহজীকরণের একটি ধাপ বলে তিনি মন্তব্য করেন।

ভ্যাট বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, নানা কারণে জটিলতা বাড়তে বাড়তে এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, এখন শুধু সরকারকে ভ্যাট দেয়ার জন্য ভ্যাটদাতাকে উঁচু বেতন দিয়ে কর্মচারী ও পরামর্শক রাখতে হয়। তার পরও কখনো কখনো এমন সব সমস্যার উদ্ভব হয় যে ব্যবসা-বাণিজ্য শেষ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। ভ্যাট দেয়ার দায়িত্ব পণ্য বা সেবা ক্রেতার, বিক্রেতার নয়। ভ্যাট হলো ভোক্তা কর। ক্রয়-বিক্রয়ের সময় যেহেতু ক্রেতা সরাসরি সরকারি কোষাগারে ভ্যাট জমা দিতে পারে না, সেহেতু বিক্রেতাকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে, বিক্রয়মূল্য গ্রহণ করার সময় ভ্যাট নিয়ে রেখে দিতে এবং ক্রেতাকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে, ক্রয়ের সময় ভ্যাট অংশ বিক্রেতার কাছে দিয়ে যেতে। বিক্রেতা এভাবে সারা মাস ধরে ক্রেতার কাছ থেকে ভ্যাট নিয়ে রাখবে। তারপর মাসের শেষে বিক্রেতা হিসাব করে ভ্যাট সরকারি কোষাগারে জমা দিয়ে দেবে। এটা হলো বর্তমান পদ্ধতি।

সার্বিক বিষয়ে গবেষণা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র‍্যাপিড) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পদ্ধতি সহজ করলে ভ্যাট আদায় বাড়বে। ভ্যাট আদায় বাড়ানোই তো মূল উদ্দেশ্য। যারা এখন ভ্যাট দিচ্ছেন, তাদের জন্য হয়তো এ সিস্টেম আদৌ কাজে লাগবে না। অনলাইন পদ্ধতি শুরু করলে সবাই ফরমাল ওয়েতে আসবে। তবে বেশি ব্যবসা করে কম হিসাব দেখালে একটা শুভংকরের ফাঁকিও থেকে যাবে। সেক্ষেত্রে অডিট হতে পারে। এছাড়া একটা চ্যালেঞ্জ হলো অনেক ভ্যাট; যেগুলো প্রযোজ্য, যেটা দেয়া উচিত, সেখানেও লুকিয়ে রাখার প্রবণতা রয়েছে। সেখানে এমন সিস্টেম তৈরি করে দিলে কীভাবে যাচাই-বাছাই হবে? যাচাই-বাছাই করলে আবার প্রশ্ন উঠতে পারে, হয়রানি করা হচ্ছে।’

আরও